Wednesday, 30 December 2015

স্বপ্ন

অহর্নিশ ডাকাডাকি। কোমল মখমল জড়ানো রাত। ঘরের চাঁদ ডুবে গ্যালে মন হয়ে ওঠে চিত্রশিল্পী। খোলা ক্যানভাসের বুকে অদৃশ্য কালি তে তৈল ছবি। নগ্ন কোনো শরীর, লম্বা চুল, ভারি নিতম্ব, আর সুউচ্চ স্তন, নাহ....আর কোনো কিছু আঁকা নেই, ভাবনা নেই, কল্পনা নেই, বাস্তবতা বলে কোনো শব্দ নেই। ব্যর্থ শরীরের অনুরণন। মুখ ভিজে যাওয়া ঝর্ণাধারা। ব্যর্থতাটুকু মুছে দিতে দরকার আলো।

আলো জ্বালালে স্বপ্নেরা হারিয়ে যায়, বন্ধ ঘরে জানালা দিয়ে আসে হেমন্তের বাতাস। শিউলি ঝরা উৎসবের শেষে, ক্লান্তি ঝেড়ে দিলে প্রান্তিক ঘামের বুকে চিঁড়ে নেমে আসে কুয়াশা। শুনেছি, এখানে আগে তাঁতি পাড়া ছিলো। এখানে বোনা হতো মসৃণ কাপড়। এখানে শুনেছি বারো মাস অভাব ছিলো, ছিলো খামখেয়ালী প্রাকৃতিক আবহাওয়া। এখানে কোনো কবি আসেন নি কখনো।

সময় বদলে গ্যালে, তাঁতঘর বিলুপ্ত, আবহাওয়া এখনো খেলে যায় তার নিষিদ্ধ খেলা। এখানে এখন ইন্দ্রজাল দেখানোর মতো অনেকেই আছেন, প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করে যাচ্ছেন একেকটি জাদু। এখানে একজন চিত্রশিল্পী এসেছেন, উনি নারীদেহ আঁকেন না, অশ্লীলতার অভিযোগ মাথা পেতে নেবার ভয়ে।

এখানে কোনো কবি আসেন নি, তাই অন্ধকারে এখনো ছবি আঁকতে হয় দরজা জানালা বন্ধ করে, আর মাঝপথে লাইন ছিটকে যায় বারবার। এই শহরের সাধারণ মানুষ স্বপ্ন দেখেন এই শহরে একদিন একজন কবি আসবেন, খুব শীঘ্রই।

Monday, 28 December 2015

কনফেশন

ইমেল নাঈম

আমি আদর্শ কোনো প্রেমিক নই...কবিতার পাতায় নাম লিখে রাখা শিরোনামে অতীত লিখেছিল কিছু কৃষ্ণচূড়া। ডায়রির ভাজে শুকনো ফুল অম্লান শরীরে জানান দেয় অতীত ছুঁয়ে যায় হতাশায়, গ্লানিতে, ব্যর্থতায়।

প্রথম যার প্রেমে পড়ি তাকে এখন মনে পড়ে না, ভুলে গেছি ছোঁয়া। মান অভিমান পর্বের মাঝে প্রেম পর্ব আর আবেগ টুকু অস্পৃশ্য ছিলো বলেই নীরব হয়ে থাকা।

দ্বিতীয় জনকে খুব মনে পড়ে। চেহারাটুকুও মনে পড়ে, রসায়ন মনে পড়ে, আঙুলের চাহিদাও মনে পড়ে....কতই বা বয়স, ষোলো বা সতেরো... মুঠো আলাপন ছিলো না, ছিলো চিরকুট, সিগারেটের প্যাকেটে ছোট্ট অনুভূতির পাশাপাশি বিশাল বিশাল চিঠি আসতো রঙবেরঙ কালিতে। সবকিছুর পরেও আরো একবার নীরব হতে হয় নানাবিধ কারণে।

এরপর, তৃতীয়... চতুর্থ... পঞ্চম, এদের নিয়ে বেশি আলোচনা করে লাভ নেই। ক্রমাগত শিখে নিয়েছি চাহিদাপত্রের মাপজোখ, হাসিমুখের অন্তরালে দুঃখের ঝর্ণাধারা, আগাছার প্রতাপে গাছ নিরুপায়, নিরূপণ করা সময়ের ভিড়ে ব্যর্থ এক নাম।

নিজেকে ব্যর্থ প্রেমিক মনে হয়, প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়াই। তাকিয়ে থাকি প্রতিবিম্বের দিকে, চোখের দিকে তাকাই, দেখি ক্রোধ নেই, প্রাপ্তি নেই, হতাশা নেই, প্রেম নেই, চাহিদা নেই, তাড়না নেই, এষণা নেই...

অথচ, ইতিহাসে আছে নিঃসঙ্গ মানুষ নিজেকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসে।

Sunday, 27 December 2015

অন্ধকার ৬

একটি অন্ধকার পথ আঁকড়ে ধরেছে পুরনো নেকড়েবাঘ। সংখ্যাতত্ত্বের ভুল অংকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারে না আমাদের চোখ। তবুও ব্যর্থ প্রয়াসে গ্লানি আঁকতে বসেছে একদল অপরিপক্ক চিত্রকর। ঘৃণাভরে আঁকছে দানবের ছবি। এরপর সুযোগ পেলেই তার প্রদর্শনী। চারপাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে দূষণ, পচা গন্ধে ভরে যাচ্ছে সব দিক।

ইতিহাসকে অস্বীকার করার মন্ত্র পাওয়া যায় কোথায়, তা নিয়েই অনেক কান কথা লুকানো। আমি দেখি অন্ধ বিভ্রান্ত কিছু মুখ, যারা ভ্রান্ত বিশ্বাসে বকে যাচ্ছে সত্যকে অস্বীকার করে, অসত্যের জয়গানে লিখে রাখছে নিজেদের নাম। প্রচার করছে তাদের চেহারা বড়ো গলায়, ক্ষতবিক্ষত শরীরে।

কোনো গ্লানি নেই চেহারায়, নেই কোনো হাহুতাশ। স্বাধীনতা পেয়েই যেন স্বার্থের খেলায় বিকিকিনি তে নিলামে উঠছে মানচিত্র। সাতান্ন সংখ্যাটি ব্যর্থ আজ মানবতার আড়ালে। নাকি ভোটের অংকের মারপ্যাঁচে সেও পড়েছে ভদ্রতার মুখোশ।

এভাবেই কেটে যায় দিন, একদিন সভ্যতা গড়ে তুলবে জাদুঘর। সেখানে মুখোশ ঝুলবে মানুষের চেহারার আদলে। সারা পৃথিবীর মানুষ সেখানে যাবে ঘৃণা জানাতে। সেদিন সেখানে সবচেয়ে অবহেলায় আপনিও স্থান করে নিবেন। মানুষ আপনাকে নিয়ে আফসোস করবে, আপনার আত্মাও সেটাকে নিয়েও আত্মতৃপ্ত মনে গুণগান গাইবে।

কথা দিলাম....

Wednesday, 23 December 2015

পোস্টমর্টেম

অন্ধকার গলিতে আটকে যেতে পারে আমাদের পরিচয়
দিন ফুরালে আমরা কেউ নই কারো। ছায়াবৃত্তে অবিশ্বাস
লুকিয়ে সারি দৈনন্দিন নৈশভোজ, তৃপ্তির ঢেঁকুর গিলতে
বসে আবিষ্কার করি খুব অচেনা নিজেকে, আয়নার চোখে
রাতের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতির নিভু নিভু আলোকচ্ছটা
মুছে দিলে পুরোটা জুড়ে শুধু বাকি থাকে নিঃসীম অন্ধকার

এরপর অদ্ভুত চিন্তার পসরা সাজিয়ে গল্পের বিন্যাসে
প্রার্থনায় ডেকে যাওয়া নাম, ঢেকে যাওয়া নামের মিছিলে
নিঃশব্দে হেঁটে চলা পথের বুকে শুভ্রতার পাঁচিলে হারিয়ে
ফেলার মৃদু ঝাঁকুনি টা বড্ড রহস্যময় এখনো কানে বাজে
বিছানায় দৌড়ে চলে নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ী, স্মৃতির কার্নিশে

কান পাতলে শুনি হৃদস্পন্দন, অনুভব করি প্রবাহিত
শিরা উপশিরা ভেদ করা রক্তকণাদের মুক্ত বিচরণে
উড়ে আসা ক্লেশ, ক্লেদহীন মাখামাখি সবাক চিত্রাঙ্কনের
পর অবশিষ্ট স্পন্দন মুছে যায়, জেগে থাকা চোখের ভিড়ে
অর্ধ অবচেতন মনের উঁকিঝুঁকি শেষে ক্লান্তির ভ্রমণে
কোথাও কোনো বৃত্ত নেই, নেই দীপ্ত শ্লোগান মুখর আজান।

Monday, 21 December 2015

একটা সাদামাটা দিন

ব্যাখ্যাত অনেক প্রশ্নের জানতে গিয়ে হারিয়ে
গেলো জন্মের দাগ, যাত্রা পথে অনর্গল ভ্রম।
এই কম্পাসের কাটায়, মানচিত্রের বুক জুড়ে
অর্গলে যে কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হয় অরণ্যের
সবটুকু আলিঙ্গন, তার কোনো সেবিকা নেই।

নেই নেই বলেই ঠায় দাঁড়িয়ে অসভ্য সমাজে
আঁধার ঘরে চব্বিশ ইঞ্চির একটা জানালা,
এনার্জি সেভিংস লাইট, সদ্য আগত শীত
কুয়াশার চাদরে আটকে যাওয়া লেপ ঘুম
অলসতার মোড়কে আটকে যায় বেড টি।

দিন ছোটো হতে হতে সূর্য সাক্ষাৎকার কঠিন
চোখ বন্ধ করে আরো কিছুটা সময় পার
আলসে দিনের মধ্যদুপুরে ঠিকই লুকিয়ে
সোনালি আকাশ মিষ্টি হাসিতে লুটিয়ে পড়ে
পশ্চিমে। পত্রিকার পাতা উল্টাই না আর...

সন্ধ্যাকালে বোকাবাক্সে চাটুকারিতার বিজ্ঞান
প্রতি ঘণ্টায় তোঁতা পাখির মুখস্ত বুলির
মতো রাশিফল পাঠিকা সহাস্য মুখে দিচ্ছেন
নিউজ বুলেটিন। পাড়ার দোকানে চা খেতে
বসে শোনা যায় অন্য লোকের মন্দ বিজ্ঞাপন।

সাদামাটা গল্পের সমাপ্তিতে ব্যক্তিগত প্রাপ্তিরা
অবহেলিত হতে থাকে খেয়ালে বেখেয়ালে,
ক্ষতরা ক্রমাগত বড় হলেই নাকি বিজয়ী হয়
একটা সাদামাটা দিন আমাকে এর চেয়ে
বেশি কিছু দিতে পারেনি কখনো, কোনোদিন।

Saturday, 19 December 2015

জ্বর

তাপমাত্রা পরিবর্তন এখন অনুভূতির শূন্যতা
ছাড়া আর কোনো আবেদন রাখে না
এন্ড্রোয়েডের হেডফোনে ভেসে আসে ব্লুজ
গিটারের ছয় তারে যেন ভিন্ন সুরের খেলা

নিজের কাছে অচেনা হলে ফেরার পথটি
মিশে যায় অনেকগুলো পথের মাঝে,
নিজের বলে কোনো কিছুই থাকে না।
অধিকার, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, ঈর্ষাবোধ, সখ্য
এসব শব্দগুলো হারিয়ে যেতে থাকে
অভিধান থেকে অনেকদূর...

ঠাণ্ডায় লেপ কাঁথার ভিড়ে ঋতু কাঁপানো
সময়টাও গ্রহণে অপারগ শরীরে দেখি
মানুষের উঁকিঝুঁকি, মুখবই জুড়ে ব্যক্তিগত
প্রচারণায় চোখে পড়ে দেখা সাক্ষাৎ,
ব্যক্তিগত সুখদুঃখ, অচেনা মানুষের ছবি
গেট টুগেদার কিংবা আড্ডামুখর মুখ

আমার হেড ফোনজুড়ে বাজতে থাকে
এক্সপেরিমেন্টাল রক,
প্রোগ্রেসিভ রক,
অল্টারনেটিভ রক,
ব্লুজ অ্যান্ড জ্যাজ রক,
আর টেবিলের এক কোণায় পরে আছে
উৎপলকুমার, একফ্লাক্স উষ্ণ পানি,
অর্ধেক খালি এক পাতা প্যারাসিটামল।

Saturday, 12 December 2015

ডাক

প্রতিবিম্বের ঘোর কেটে আসে দুঃস্বপ্ন
আলটপকা সময়ের কার্নিশজুড়ে
স্মৃতিদের আনাগোনা। ঘাসেদের ছুঁয়ে
ঝরে পড়ে একগুচ্ছ অবন্তিকা ফুল ।

রাত বাড়লে নীরব হয় ল্যাম্প পোস্ট
হেমন্তের কুয়াশা আর শীতের ছায়া
মনহরা সবকিছু, তবুও শূন্যতা।
ভিতরটা শুনশান, বাতিটা জ্বলছে...

ল্যাপটপে খসখস শব্দে আত্মনিষ্ঠ
এক শিল্পী নীরবে গড়ে যান স্থাপত্য।
এশট্রে জুড়ে ছাই, তবুও বেনসন
পুড়ে যায় ক্রমাগত, কফির পেয়ালা
ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে ক্লান্ত নয় আর

কবিতার পাতা ভরে গেলে বেজে ওঠে
ক্লেডারম্যান, ইউটিউবে মগ্নতার
শীর্ষচূড়া ছুঁলেই রাত গভীর ঘুমে
আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ক্লান্তির ভিড় ঠেলে

তখন কান পেতে একটি বার শোনো
মায়াবতী নারী কণ্ঠ ক্রমশ ডাকছে
দেবাশীষ... দেবাশীষ... দেবাশীষ বলে...

ইমেল নাঈম'র কবিতা ভাবনা

কবিতা ভাবনা ও গুচ্ছ কবিতা ঈমেল নাইম কবিতা বললেই আমি হেলাল হাফিজের উৎসর্গ কবিতাটাকেই মনে করি। কবি নিজেই বলেছেন কবিতা অবিকল মানুষের মতো, চোখ, মুখ, বিবেকের কথা।

কবিতা মানুষের জীবনগাঁথা, সভ্যতার শ্লোগান। কবিতা নষ্ট সময়ে জ্বলে ওঠা এক প্রদীপ, যে কিনা ভুল পথের পথিক কে পথ দেখায়। কবিতা অচেনা এক নারী, প্রথম প্রেমের স্পন্দন। কবিতা নদী, কষ্ট ভুলে থাকার একমাত্র অবলম্বন। কবিতা একটা ইঙ্গিত, একটা চিত্রপট। ভ্যানঘগের আঁকা ল্যান্ডস্কেপ। ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীর নিপুণ আঙুলে তৈরি কোন স্থাপত্য কলা। এক কথায় কবিতা কবিতাই। কবিতা বলতে কবিতাই বুঝি। অন্যকিছু বুঝে উঠি নি।

কবিতা আটকে নেই নির্দিষ্ট কোনও বলয়ে। সে বৈশ্বিক। বৃত্ত, বৈভব, ক্ষেত্রফল, ব্যঞ্জনা, উৎকর্ষতা কোনও কিছু নিয়ম মেনে চলে না, অথচ তার মাঝেই খুঁজে পাওয়া যায় এইসব মৌলিক উপাদান। শব্দের পিঠে শব্দ বসিয়ে অদ্ভুত এক ছন্দের খেলা যা প্রতি মুহূর্ত আলোড়িত করে যায় পাঠককে। কবিতা কে ঠিক মতো আঁকা যায় না, অনুভব করতে হয়। অনুভব জিনিষটাও স্রষ্টার সমান্তরালে নাও যেতে পারে। তবুও পাঠকের মস্তিষ্কের সামান্য যেই বোধটুকু নাড়িয়ে দেয় সেটাকে নিয়েই দাঁড়ায় একটি কবিতা।

কবিতা হলো কবির মৌলিক দর্শন। কবি তার বিশ্বাস কে প্রকাশ করেন নানাবিধ আকার ইঙ্গিতে। এই দর্শনে অস্তিত্বগত ঐতিহ্যের উপলব্ধি, সংবেদনশীলতা ও নির্ভরশীলতাকে পক্ষপাতহীনভাবে ফুটে উঠে। কবিতা যেহেতু বোধের চরিতার্থকে আদর্শমণ্ডিত করে, চিন্তার স্তর বিন্যাস উন্নত করে, সৃষ্টির পথে চেতনার অস্তিত্বের অবয়ব দেয়, পূর্ণাঙ্গ করে সম্মোহন শক্তির মাধ্যমে, তাই এখানে প্রতিনিয়ত সে শব্দ-ভাষা শক্তির রূপান্তর ঘটিয়ে চলছে। নিজের অস্তিত্বে, শব্দে, পরিভ্রমণ করছে সময়, কাল, যুগ-ক্ষণ।

একটা কবিতা গড়ে ওঠে কি করে? এমন প্রশ্ন প্রায়ই নাড়া দিয়ে যায়। কবিতা গড়ে ওঠে তার চারপাশ, একজন কবির বেড়ে ওঠা সমাজ ব্যবস্থা, অবক্ষয়, রাজনৈতিক অবস্থা, স্বপ্ন আশাবাদ সব কিছু মিলেই গড়ে ওঠে একটা কবিতা। কবি তার লেখাকে বারবার ভাঙেন আবার গড়েন, প্রতিটা মুহূর্তই শুদ্ধতার পথে হেঁটে যান। তার এই হেঁটে যাওয়ার পথটি অনন্তকালের, বন্ধুর পথে একাকীত্বের শ্লোগান।


প্রকাশিতঃ বুক পকেট

বোহেমিয়ান

পরম বন্ধু ভেবে ছায়ার কাছে এসে বারবার ভুল করি
প্রাচীন দেয়ালের সাথে সখ্য পাততে গিয়ে অনুভূত হয়
মহাশূন্যের নীরব এক এস্রাজ কে, আত্মনিমগ্ন স্রষ্টাকে।
পলেস্তারার খসে পড়া শব্দে, ধুলো ঝড়, খড়কুটো জীবন

ভুল উপত্যকা ভ্রমণে অবিরাম ছুটে বোহেমিয়ান প্রেম,
আরব্য রজনীর রূপকথা, নিঃসঙ্গ রাজকন্যার আহ্বান
প্রতিবন্ধকতার আড়ালে হাসা অদ্ভুত হাসি — তাকেও ভয়,
চিন্তার ভাজে সকালের রোদ্দুরে ঝরে বিরক্তির উপাখ্যান

জিপসি যাযাবর, পথের পাশে পাতানো আমার সংসার
তাঁবুর ভিতরে অবিরাম ঢুকছে রাতের শীতল হাওয়া
দিনের তপ্ত বালুকণায় উটের পিঠে খাদ্যের অন্বেষণ
সময় পেরোলে যাবো নতুন কোনো শহরে জীবনের খোঁজে

প্রতিবার ভালবাসার কাছে অবহেলিত হয়ে হেরে যাই
তবু… নিক্কণের শব্দ, অদেখা হাসি, ভাবায় আমার পথকে।

প্রকাশিতঃ বুক পকেট

অঙ্গার

আলো আঁধারি খেলা, মুছে যায় পূর্বের অস্তরাগ
নিয়ন বাতির শহর, নীরবতা ভাঙার শব্দ
ক্লান্ত মুখ ছুঁয়ে যায়, মলিন পাতার স্পর্শ ধ্বনি
মর্মর করে ভেঙে পড়ে, চেয়ে থাকে অবাক চোখ।

এই দৃষ্টিপাতে ক্লান্তি নেই, শুধু মৌন রক্তপাত
অশ্রুকণা ঝরে, যেটুকু ব্যথা সম্পূর্ণ নৈসর্গিক
অপেক্ষারত এক তুমুল ঝড়, অদৃশ্য ভাঙন
পৃথিবী শান্ত হলেও ঠিকই উত্তাপ থেকে যায়।

ভঙ্গুর শরীরে উঠে দাঁড়াই, অবাধ্য যোগফল
প্রাপ্তির নিরিখে হেরে যাওয়া এক নাবিক মাত্র
প্রশ্ন করো না আর, উপভোগ্য হোক এ’ পরাজয়
কঠিন বাস্তবতার মাধ্যমে, বিজেতার কণ্ঠে স্তুতি।

পুড়ে যাওয়া হৃদয়, রক্তপাতে ভাসমান দুঃখ
জ্বালিয়ে অঙ্গার করে, গোপন রাখে নি বাকী কিছু।

প্রকাশিতঃ বুক পকেট

অন্ধ পথিক

কোথায় আগুন, শান্ত স্থবির সবটুকু
বিভ্রান্ত সময়ের সাথে ছুটে চলা পথ
ঘূর্ণন গতিতে দৌড়ে চলেছে ঘড়ি
ঘণ্টার কাটা শোনা যায় বারবার।

ভাবুকতা নিয়েই পড়ে থাকে মন
গল্পের শেষে টিকে থাকে অস্থির রাত
পূর্ণ চাঁদ অবহেলায় হেসে ওঠে

শোনা যায় দূরের সাইরেন, গাড়ীর হর্ন
ট্রেনের কুঝিকঝিক সুর তোলা ধোঁয়া
রাস্তার ধারে পড়ে থাকে অচেনা ফুল
থাকে অব্যাখ্যাত কী সব যুক্তি বিদ্যা!

কোথায় আগুন? শান্ত সব অলিগলি…
অহর্নিশ ডাকাডাকি, রাতবিরাতে
অন্ধ পথিক পথ খুঁজে নিশীথ রাত্রিতে।

প্রকাশিতঃ বুক পকেট

Friday, 11 December 2015

অন্ধকার ৫


এটাকে ঠিক কবিতা বলা যায় না। প্রতিবাদও না। অধিকার আদায়ের কোনো বক্তব্য লিপিবদ্ধ নেই খাতায়। তবুও আপনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে। একদম সন্মুখে চোখে চোখ রেখে শান্ত ভাষায়, দৃঢ় চিত্তে, নির্ভীক মননে কিছু কথা আপনার সামনে বিড়বিড় করতেই হয় আমাদের। শোনার মতো সময় নেই আপনার, আর হবেই বা কি করে, আপনার এখন কতো কাজ। পুরো একটা নিশান আপনার আঙুলে নাচে, উড়ে, ঘুরে, ফিরে।

অজস্র কথা চাপিয়ে দিয়েছেন আমাদের উপরে। স্বপ্ন দেখাচ্ছেন দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা। কিন্তু ইঁদুর বিড়ালের খেলার মতোই খেলে যাচ্ছেন পুরোটা সময়। আপনার কথাগুলো ক্রমশ মিথ্যে প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হচ্ছে। আর একের পর এক ঘটনা আপনাকে করে তুলছে প্রশ্নবিদ্ধ। পত্রিকার পাতা খুললে এখন ভেসে আসে দুর্ঘটনার সংবাদ। তালহীন ঘুড়িটিও আকাশের ঠিকানা পেলে নিজেকে রাজা মনে করে বসেন। আর ক্রমশ সুতোর সান্নিধ্যটুকুও ভুলে যান।

ভূমিকার বাইরে এসে কিছু কথা বলার থাকে। বলতে গেলে সাতান্ন এসে জগদ্দল পাথরের মতো আটকে ঘরে। ঘর থেকে বেরোই না, চুয়ান্ন শব্দটা খুব পরিচিত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করায় আপনাকে ফুলেল শুভেচ্ছা। যদিও আপনার আত্মীয়স্বজন অনেকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ঘুরে ফিরে আসে বারবার। আপনি তাদের বিপক্ষে সবসময় মিস্টেরিয়াস নীরবতা পালন করেন। আমি চিমটি কেটে পরীক্ষা করি চেতনার থার্মোমিটার।

পেপার খুলেই চমকে উঠলাম। মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অনেক চিহ্নিত রাজাকার, অমুক্তিযোদ্ধারাও এখনো পেয়ে যাচ্ছেন ভাতা। এরচেয়ে বেশি কিছু বলার নেই। আমি শালা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। সবসময় বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মেতে থাকি। আমার কপাল অনেক ভালো, অন্য দশজন ছেলের মতো চাকরি নামের সোনার হরিণের খোঁজে ব্যস্ত থাকতেও পারতাম। আমিও তো ম্যানহোলে পড়ে নেই হয়ে যেতেও পারতাম, হয়ে যেতে পারতাম গুম, মধ্যরাতে লাশ পাওয়া যেতো কোনো ঝোপঝাড়ে। কিংবা চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে মরেও যেতে পারতাম।

এইযে আমার বেঁচে থাকা, মধ্যবিত্ত মানসিকতার লড়াই...এটা নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই আগামীর পথ।


Thursday, 10 December 2015

কিছু মুখ

প্রাচীনকালে গল্পগুলো অন্যরকম ছিলো
রূপকথার মিহি শিল্প, উপদেশের ভাজে
খোদাই করা কিছু মুখ, হাসি, দৃষ্টিকোণ।  

সূর্যের আলোতে পরিণত হয় চিন্তাজগত
রূপকথামালা হারিয়ে যায়, শূন্য পূর্ণ হয়
অন্যকোনো রসালো প্রাপ্তবয়স্ক উপকরণে,
সেলুলয়েড ফিতার দিনগুলো বড্ড টানে।  

এই শহরের নিষ্প্রাণ সাজ বৃষ্টি দিনে,
জমাটবদ্ধ পানি, পাতাদের নীরব ঝরে পড়া
ফাঁকা রাস্তা, কেউ রাখে না হাত কারো হাতে
আয়নার সামনে নিজেকে অচেনা লাগে  

চোখের সামনে যা কিছু দেখি কঠিন বাস্তব
চাকচিক্যময়তা থমকে দিয়েছে চারপাশ
কিছু নিভৃতচারী মুখ, হাসি, ইশপের গল্প
সাজিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

প্রকাশিতঃ বুক পকেট